যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান ইইউ ‘র
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানিয়েছেন ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) পররাষ্ট্রনীতি বিষয়ক প্রধান কাজা কালাস। তিনি জানিয়েছেন, এই সংঘাত কীভাবে নিরসন করা যায়, সে বিষয়ে ইইউ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশের সরকারের সঙ্গে আলোচনা করছে।
ব্রাসেলসে রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে কালাস বলেন, হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলের স্বাধীনতা পুনরুদ্ধারের প্রচেষ্টায় ইউরোপীয়দের অংশগ্রহণের পথ বন্ধ হয়ে যায়নি। তবে এটি একটি কূটনৈতিক সমাধানের অংশ হিসেবে হওয়ার সম্ভাবনাই সবচেয়ে বেশি।
ইরান বর্তমানে তেল, গ্যাস ও অন্যান্য পণ্য পরিবহনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ করে রেখেছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পথটি উন্মুক্ত করতে সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার জন্য ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রতি বারবার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে ইউরোপের একাধিক দেশ তার এই আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছে।
ইউরোপীয় নেতারা জানিয়েছেন, তারা এমন একটি যুদ্ধে নিজেদের বাহিনীকে বিপদের মুখে ফেলতে রাজি নন, যা তারা শুরু করেননি। যদিও ট্রাম্প সতর্ক করেছেন যে, তাদের এই অনীহা ন্যাটো জোটের জন্য নেতিবাচক পরিণতি নিয়ে আসতে পারে।
কাজা কালাস বলেন, ট্রাম্পের অধীনে যুক্তরাষ্ট্রের কিছু পদক্ষেপ বা ইরানে তাদের প্রকৃত লক্ষ্য কী—সেটি ইউরোপের কাছে স্পষ্ট নয়। তবে ইউরোপ তাঁর খামখেয়ালি আচরণের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে গেছে এবং প্রতিক্রিয়ার ক্ষেত্রে এখন অনেক বেশি 'শান্ত' থাকছে।
যুদ্ধ শেষ করার সময় এসেছে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে এস্তোনিয়ার সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বর্তমানে ইইউর ২৭টি দেশের পররাষ্ট্র ও নিরাপত্তা নীতি বিষয়ক উচ্চ প্রতিনিধি কালাস বলেন, "অবশ্যই। আমি মনে করি... যদি এই যুদ্ধ থামে তবে সেটি সবার স্বার্থেই যাবে। যুদ্ধের সমস্যা হলো, এটি শুরু করা যতটা সহজ, থামানো তার চেয়ে অনেক বেশি কঠিন এবং এটি সবসময়ই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।"
তিনি জানান, ইইউ পক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে এনে যুদ্ধ থামাতে 'কূটনৈতিকভাবে' সাহায্য করতে আগ্রহী। তিনি বলেন, "আমরা উপসাগরীয় দেশসমূহ, জর্ডান ও মিসরের মতো আঞ্চলিক দেশগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করছি। আমরা দেখছি যে ইরান, ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের জন্য এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার কোনো প্রস্তাব আনা যায় কি না, যাতে সবার সম্মান বজায় থাকে।" তবে এই আলোচনার বিষয়ে তিনি বিস্তারিত আর কিছু জানাননি।
গত বছরের জানুয়ারিতে ট্রাম্প আবারও হোয়াইট হাউসে ফেরার পর থেকে ইউরোপ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সম্পর্কের যে টানাপোড়েন শুরু হয়েছে, এই যুদ্ধ তাকে আরও চরম পর্যায়ে নিয়ে গেছে। কালাস বলেন, "ইউরোপীয় দেশগুলোর প্রধান উদ্বেগের জায়গা হলো এই যুদ্ধ শুরু করার আগে আমাদের সঙ্গে কোনো পরামর্শ করা হয়নি—বরং উল্টোটা হয়েছে। অনেক ইউরোপীয় দেশই যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলকে এই যুদ্ধ শুরু না করার জন্য বোঝানোর চেষ্টা করেছিল।"
যুদ্ধ ইতোমধ্যে ইউরোপের ওপর বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কঠোর অবস্থানের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে গেছে।
কাজা কালাস বলেন, "হরমুজ প্রণালীতে নিজেদের মানুষকে বিপদে ফেলতে কেউ প্রস্তুত নয়। আমাদের কূটনৈতিক পথ খুঁজে বের করতে হবে যাতে এটি খোলা রাখা যায়। অন্যথায় বিশ্বে খাদ্য সংকট, সার সংকট এবং জ্বালানি সংকট তৈরি হবে।"
যুদ্ধ চলাকালীন ইউক্রেন থেকে শস্য রপ্তানির জন্য জাতিসংঘ-ঘোষিত চুক্তির আদলে হরমুজ প্রণালীর জন্য একটি মডেলের প্রস্তাব দিয়েছেন কালাস। ওই চুক্তির ফলে রুশ হামলা ছাড়াই ইউক্রেন কৃষ্ণসাগর দিয়ে শস্য, খাদ্যসামগ্রী ও সার রপ্তানি করতে পারছে।
তিনি জানান, এই আইডিয়াটি নিয়ে তিনি জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের সঙ্গে কথা বলেছেন এবং জাতিসংঘ এটি নিয়ে কাজ করছে। কালাস বলেন, "এখন প্রশ্ন হলো প্রতিবেশী দেশগুলো, বিশেষ করে ইরান এতে রাজি হবে কি না।"
কমেন্ট বক্স